বিবর্ণ ঈদ, অম্লান সেই স্মৃতিগুলো

ঈদ মানেই আনন্দ,ঈদ মানেই খুশি। প্রতিবছর এই ঈদকে ঘিরে আমাদের থাকে অনেক পরিকল্পনা, থাকে অনেক আয়োজন। ঈদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কেনা,ঈদের দিন নতুন পাঞ্জাবি গায়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা,বন্ধু-বান্ধব ও আত্বীয় স্বজনদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা,বাড়ীতে বাবাসহ বড়দের কাছ থেকে ঈদ সালামি নেওয়া,মায়ের হাতে রান্না করা সুস্বাদু খাবার খাওয়া, বিকেলে বন্ধুদের সাথে ইচ্ছে স্বাধীন কোন গন্তব্যে ঘুড়ে বেড়ানো এবং রাতে টিভি সেটের সামনে বসে ঈদের জমজমাট অনুষ্ঠান উপভোগ করা ইত্যাদি। এ সবই হচ্ছে তরুণদের ঈদের দিনের একটি নিয়মিত রুটিন। কিন্তু যারা জীবন আর জীবিকার প্রয়োজনে ভীন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তাদের  ঈদ কাটে অনেকটা সাদামাটাভাবেই। দেশের ঐ বর্নিল  ঈদের ছবি এখানে স্বপ্নেও ধরা দেয় না ।  এখানে ঈদ আসে নীরবে,কোন আগমনী বার্তা ছাড়াই। ঈদের দিন কাটে অন্যান্য সাধারন দিনের মতই। থাকেনা বিশেষ কোন পরিকল্পনা। যদিও মস্কেতে অবস্থিত বাংলাদেশ দুতাবাস প্রতিবছর অনেক উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে  ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযাহা উদযাপন করে। মস্কোতে বসবাসকারী সব প্রবাসী বাংলাদেশীদেরকে এই অনুষ্ঠানগুলোতে আমন্ত্রন জানানো হয়। দিনব্যাপী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,শিশুদের হৈ-হুল্লোড় এবং কমিউনিটি সদস্যদের মিলনমেলা যা প্রবাসের এই সাদামাটা ঈদের মাঝে কিছুটা হলেও আনন্দের সঞ্চার করে।

তবে যারা বিদেশে পড়াশুনার জন্য আসে তাদের অনেক সময় ঈদের এই সামান্য আনন্দটুকোও ভাগ্যে জোটে না । কখনও বা ক্লাস,পরীক্ষা আর কুইজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকতে হয় যে  ঈদের দিনটা চোখের সামনেই হারিয়ে যায়। এত ব্যস্ততার মাঝেও বহুদূরে থাকা পরিবারের প্রিয় সদস্যদের সাথে  টেলিফোনে  ঈদের  শুভেচ্ছা বিনিময় করতে কেউই ভুলে যায় না । কারণ ঈদের দিনে তাদের এটাই একমাএ আনন্দ।

প্রবাসে ঈদ কাটানোর  অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলি রাশিয়ার রাজধানী মস্কেতে অবস্থিত স্বনামধৈন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের সাথে। এইসব  শিক্ষার্থীদের প্রবাসে স্বজনহীন  ঈদ কাটানোর সেই গল্পই শোনাব আজ ।

রুশ সরকারের বৃত্তি নিয়ে রেজা  রাশিয়া এসেছেন চার বছর আগে। পড়াশুনা করছেন মস্কোর গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক রিলেশনস বিভাগে। ঈদ উদযাপনের জন্য রেজার পরিবার প্রতিবছরই রাজধানী ঢাকা ছেড়ে শিকড়ের টানে চলে যায়  গ্রামের বাড়ী  বরিশালে। এখানেই  রেজা  তার বাবা-মা ও বড় ভাই-বোনদের সঙ্গে ঈদ কাটাতেন।  রেজা জানালেন, ঈদের পূর্বে বাড়ী যাওয়ার সময় যাত্রা পথের নানা ঝক্কি-ঝামেলার পরও পরিবারের সবাইকে নিয়ে এক সঙ্গে ঈদ করতে পারার মজাই আলাদা।

প্রবাসে ঈদ কাটানোর বিষয়ে জানতে চাইলে রেজা জানায়,বিগত চার বছরে সে ৮টি ঈদ কাটিয়েছে প্রবাসের মাটিতে। ঈদের জন্য এখানে আলাদা কোন ছুটি নেই। ঈদের  দিনগুলোতে তাকে হয়ত ক্লাস,পরীক্ষা অথবা কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকতে হয়। পরিচিত জনদের বাড়ীতে যাওয়া বা একসাথে মিলিত হওয়ার সুযোগও অনেক সময় হয়ে উঠে না । তাই ঈদকে নিয়ে তার এখন নেই কোন আলাদা ভাবনা,নেই কোন উল্লাস। রেজা জানালেন, তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ ছাএ সংগঠন প্রতিবছর ঈদের দিনে ঈদ পুণর্মিলনীর আয়োজন করে। সম্ভব হলে ঐ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নীরবেই পার করে দেন এই দিনটিকে।
মাহাবুবুল আলম চৌধুরী গণমৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ৫ম বর্ষের ছাএ। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়া এসেছেন ২০০৫ সনে। রাশিয়া আসার পূর্বে পরিবারের সাথে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ঈদ কাটাতেন মাহাবুব। এইতো কিছুদিন আগেই মাহাবুবের বাবা জনাব সালেহ আহমেদ চৌধুরী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। তাই মাহাবুবের কাছে এবারের ঈদের আনন্দ অন্যান্যবারের থেকে একটু বেশী হওয়াই স্বাভাবিক।তবে মাহাবুব শোনালেন ভিন্ন কথা।
মেডিসিন বিভাগে পড়ার কারণে সবসময়ই তার পড়াশুনায় অনেক চাপ থাকে। ইচ্ছে করলেই ক্লাস বন্ধ দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। বন্ধ দিলে জরিমানাসহ পরবর্তিতে তাকে আরও ভোগান্তি পোহাতে হবে। তাই প্রতিটি ঈদের দিনই তার ক্লাস করতে হয়। অনেক সময় পরীক্ষা বা ব্যাবহারিক ক্লাসের চাপে ঈদের নামাজ পড়ারও সুযোগ হয় না। মাহাবুব জানায়,ক্লাস এবং হাসপাতালে ব্যাবহারিক কাজ শেষে বাসায় এসে সে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পরে যে তখন কিছুই করার ইচ্ছা জাগে না । রাশিয়া আসার পর পরিবারকে ছেড়ে একা একা  প্রথম কয়েকটি ঈদ কাটাতে অনেক কষ্ট হয়েছে মাহাবুবের। সেই ঈদের দিনগুলোর কথা স্মৃতিচাড়ন  করে মাহাবুব বলেন , ” তখন আমার মনে হচ্ছিল যে, আমিই পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ!।
ঈদের দিনে মাহাবুব টেলিফোনে পরিবারের সবার সাথে কথা বলে আর বন্ধুদের সাথে ইন্টানেটে চ্যাট করেই ঈদের শুভেচ্ছা জানান। ঈদের বিভিন্ন আইটেমের মধ্যে ঈদ সালামিকেই মাহাবুব সবচেয়ে বেশি মিস করেন। মাহাবুব বলেন, ”প্রতিবারই ঈদের দিনে আমি বাসায় জানিয়ে দেই যে, ”আমার সব ঈদ সালামি যেন রেখে দেওয়া হয়;বাংলাদেশে এসে আমি একসাথে সব নিব”।
মাহাবুব ও রেজার মতই ঈদ কাটে এখানের অন্যান্য প্রবাসী বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের। প্রবাস জীবনের নিঃস্বঙ্গতা আর বাস্তবতাকে সাথী করে এরা সবাই এগিয়ে যাচ্ছেন একটি সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে। সবার চোখে-মুখে থাকে একটাই স্বপ্ন – ”এ কষ্টের একদিন অবসান হবেই” ।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s